বুয়েট শিক্ষক, যুগ্মসচিব ও প্রবাসী সন্তানেরা যখন ক্যারিয়ারের চূড়ায়: মিরপুরে মায়ের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের নেপথ্যে এক চরম অবক্ষয়ের গল্প
মহানগর ডেস্ক:
রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে যখন সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছিল, তখন হয়তো দেশের কোনো এক প্রান্তে তার এক সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মেধা গড়ার পাঠ দিচ্ছিলেন, আরেক সন্তান ব্যস্ত ছিলেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী ফাইলে স্বাক্ষর করতে, আর দূর পরবাসে থাকা অন্য সন্তানটি হয়তো গড়ছিলেন নিজের রঙিন ভবিষ্যৎ। সমাজের চোখে তারা প্রত্যেকেই একেকজন সফল মানুষ, ঈর্ষণীয় ক্যারিয়ারের অধিকারী। কিন্তু সেই সন্তানদের জন্মদাত্রী মা নুরজাহান বেগম (৭২) নিজের ঘরে নিঃশব্দে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, আর তার সাত-আট দিন পর কেবল দুর্গন্ধে প্রতিবেশীদের খবরের ভিত্তিতে পুলিশকে এসে দরজা ভাঙতে হলো। এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ পুরো দেশের বিবেক স্তব্ধ হয়ে গেছে।
গত রবিবার গভীর রাতে মিরপুর-১১ নম্বরের একটি বাসা থেকে যখন পল্লবী থানা পুলিশ নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে, তখন ঘরের ভেতরের দৃশ্যটিই বলে দিচ্ছিল আধুনিক নগর জীবনের ব্যস্ততা আর চরম আত্মকেন্দ্রিকতা কীভাবে আমাদের সম্পর্কের সুতাগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন পুরো ফ্ল্যাটজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। প্রাথমিক সুরতহাল ও তদন্ত শেষে পুলিশের ধারণা, উদ্ধার হওয়ার অন্তত সাত থেকে আট দিন আগেই ওই বৃদ্ধা মারা যান। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একটিবারের জন্যও কোনো সন্তান মায়ের ঘরে উঁকি দেননি, মুঠোফোনে জানতে চাননি তিনি কেমন আছেন বা রাতে কিছু খেয়েছেন কি না। পারিবারিক এই চরম দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতা কেবল আইনি অবহেলা নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর পারিবারিক কাঠামোর এক ভয়াবহ ফাটলকে সামনে এনে দিয়েছে।
নুরজাহান বেগমের এই করুণ পরিণতি শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়, এটি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং ‘সফলতা’র সংজ্ঞাকে এক বিরাট কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। যে মায়েরা নিজেদের জীবনের সব সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের বুয়েটের শিক্ষক বানান, সরকারের যুগ্মসচিবের মতো উচ্চাসনে বসান কিংবা বুকভরা আশা নিয়ে সুদূর কানাডায় পাঠান, সেই মায়েদেরই শেষ জীবনে এমন নিঃসঙ্গ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় চলে যেতে হবে—এই সত্যটি মেনে নিতে পারছে না দেশের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই এখন ক্ষোভ, দুঃখ আর আত্মোপলব্ধির ঝড় বইছে।
এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে দেশের জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহকেও। দেশজুড়ে চলা এই তীব্র ক্ষোভ ও শোকের আবহাওয়ার মধ্যে তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও কড়া বার্তা দিয়েছেন। বস্তুগত ও বৈষয়িক সফলতার অসারতা তুলে ধরে তিনি এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, সাত-আট দিন আগে যে বৃদ্ধা মরে পচে গেছেন, তার সন্তানেরা তো মা-বাবার কাঙ্ক্ষিত সেই সফলতার স্বপ্নচূড়া স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে ছুটতে মায়ের বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়ার খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও সন্তানদের হয়নি। শায়খ আহমাদুল্লাহ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তোলেন, যে সফলতা মা-বাবার অকৃত্রিম ভালোবাসাকে ভুলিয়ে দেয়, যে সফলতা মৃত্যুর অবর্ণনীয় মুহূর্তে মায়ের মাথার কাছে বসে এক আঁজলা পানি মুখে তুলে দেওয়ার ফুরসত দেয় না, সেই মেকি সফলতার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই।
তিনি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই নৈতিক পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন হওয়ার জোরালো আহ্বান জানান। তার মতে, ধর্মীয় অনুশাসন, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষাকে আড়াল করে যতদিন আমরা কেবল অন্ধের মতো বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সফলতার পেছনে ইঁদুরদৌড়ে শামিল হব, ততদিন সামাজিকভাবে আমাদের এই ধরনের অনাকঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক ঘটনা বারবার দেখে যেতে হবে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পশুর মতো আচরণ করার চেয়ে, সন্তানকে আগে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
মিরপুরের এই ঘটনাটি আজ জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রথম পাতায় লিড নিউজ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে কেবল এর নির্মমতার জন্য নয়, বরং এটি আমাদের সমাজকে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আধুনিক সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, আমরা জিপিএ-৫, উচ্চ বেতন আর বিলাসবহুল ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্বল—মানবিকতা ও মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধকেই হারিয়ে ফেলছি। নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহের পাশে পড়ে থাকা সমাজের তথাকথিত এই ‘উচ্চশিক্ষা’ ও ‘সফলতা’র গল্পগুলো আজ তাই চরমভাবে ব্যর্থ ও অর্থহীন বলে প্রতিভাত হচ্ছে।